কিছু কিছু স্বপ্নেরও ফাঁসি হোক
টিকটিকির সাহস নিয়ে ওইরকম একটা স্বপ্ন কেনো দেখলো জানে না আসিফ। ভয়ে আতঙ্কে ঘামতে থাকে...
টিকটিকির সাহস নিয়ে ওইরকম একটা স্বপ্ন কেনো দেখলো জানে না আসিফ। সমাজ বদলের স্বপ্ন যে সে যৌবনে দেখেনি তাও নয়। কিন্তু বিপ্লবী ছিল না কখনো। সব সময় চেয়েছে বদলটা ওর হয়ে অন্য কেউ এসে করে দিক। আর সেই আসিফই নাকি এমন দুঃসাহসিক একটা স্বপ্ন দেখেছে।
ভয়ে আতঙ্কে ঘামতে থাকে আসিফ। স্বপ্নটার কথা যদি জেনে যায় কেউ? আজকাল নাকি স্বপ্নের কথাও ফাঁস হয়ে যায় ইথারে! দুশ্চিন্তায় ঘাম ঝরতে ঝরতে বিছানা ভিজে যায়, ডুবে যায় ঘরের মেঝে। যদি সত্যিই জেনে যায়, সাদা পোশাকের লোকজন তুলে নিতে আসে, ও যে আসলে একটা টিকটিকি সেটা বোঝাতে পারবে তো?
আসিফের অবস্থা দেখে ঘাবড়ে যায় নীরা। তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন? কি হয়েছে? জানতে চায় সে।
স্বপ্ন দেখেছি। আসিফ হাঁপাতে হাঁপাতে উত্তর দেয়।
তো?
ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন। বলার সময় সেই ভয়াবহতা আসিফের চোখেমুখেও ফুটে ওঠে।
এই সাত-সকালে বাচ্চাদের মতোন ভূতপ্রেতের স্বপ্ন দেখলে নাকি? নীরা হাসতে থাকে।
দেখো, কারো মুখের ভাত আর তাজা স্বপ্ন নিয়ে মশকরা করতে হয় না। ভূতপ্রেতের চেয়ে অনেক ভয়াবহ স্বপ্ন এটা। শুনলে তুমিও কাঁপবে।
এই ভ্যাপসা গরমে কাঁপুনি হলে মন্দ হবে না। বলো, শুনি। নীরা বিছানার চাদরটা টেনে বসে।
বলা যাবে না এভাবে। উচিত হবে না। দেয়ালেও কান আছে। কোনোভাবে লিক হলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।
কি ছাতা বলছো। ধ্যাৎ। বিরক্ত হয় নীরা।
তোমার মনে হচ্ছে আমি ফান করছি; না? বলে ফেলি, লোকজন জেনে যাক, তখন টের পাবে। কিন্তু না, একটা মারাত্মক ভুল হয়ে গেছে, আরেকটা ভুল করা যাবে না। তুমি ভালো করে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থাক। বুঝতে পারো কিনা দেখো। আসিফ বলে।
নীরা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে আসিফের চোখের দিকে। বেশিক্ষণ তাকাতে পারে না, ভয় পেয়ে যায় আসিফের চোখে ফুটে ওঠা আতঙ্কের দহন দেখে। কিন্তু বুঝতে পারে না সুনির্দিষ্ট করে স্বপ্নটা। চোখ নামিয়ে নেয়।
আচ্ছা। একটা কাগজ আর কলম নিয়ে আসো। পেন্সিল হলে ভালো, লিখে মুছে ফেলা যাবে। আসিফ বলে।
নীরা পাশের ঘর থেকে এক টুকরো কাগজ আর একটা পেন্সিল নিয়ে আসে। আসিফ কাগজটা হাতে নেয়, জোনাক পোকা ধরার মতো করে কাগজটা মুঠোর মধ্যে নিয়ে আঙুলগুলো সামান্য একটু আলগা করে পেন্সিলের মাথা দিয়ে কিছু একটা লিখতে গিয়ে আর লেখে না। তোমার হাতটা দাও। কাগজটা রেখে নীরাকে বলে। নীরা আসিফের পাশে সরে বসে বাঁ হাতটা তুলে ধরে। আমি তোমার তালুকে লিখছি, তুমি চোখ বন্ধ করে পড়ে নাও। বলে আসিফ পেন্সিলের ভোতা মাথাটা দিয়ে নীরার তালুতে কিছু একটা লেখে। নীরা চোখ বন্ধ করে বোঝার চেষ্টা করে। আসিফ লেখা শেষ করার আগেই চোখ খুলে বিছানা থেকে লাফিয়ে ওঠে নীরা। অ্যাটাস বাথরুমে গিয়ে বাঁ হাতের তালুটা ধুতে থাকে লিকুইড সোপ দিয়ে। তালুতে কোনো অক্ষর নেই, তবু ডলে ডলে ধুতে থাকে নীরা। ওর অন্তরের চোখ দিয়ে পাঠ করা অক্ষরগুলোই ধুয়ে ফেলার ব্যর্থ চেষ্টাটা চালিয়ে যায় অনেকক্ষণ।
এ তুমি কি বলছ? মানে, সত্যি? বাথরুম থেকে বের হয়ে আসিফকে বলে।
তো কি বলছি!
এই স্বপ্ন তুমি দেখলে ক্যামনে? মানে দেখতে গেলে কেন?
আরে, কি অবুঝ প্রশ্ন! আমি কি স্বপ্নকে দাওয়াত দিয়ে এনেছি। বলেছি নাকি যে, আসো স্বপ্ন তোমাকে আমি দেখি!
হু, আমার বান্ধবি স্বপ্নাকে তো তুমি দাওয়াত দিয়ে ছিলে দেখার জন্যই।
কিসের মধ্যে কি নীরা?
কেন? আমি যেদিন বাড়ি নেই, সেদিন তুমি স্বপ্নাকে বাসায় ডাকতে গেলে কেন! স্বপ্না আমাকে কল করে বলে কিনা, তোর জামাই তো আসতে বলল, স্পেশাল কফি খাওয়াবে; তোর জন্য কিছু আনবো? স্বপ্না কলটা না করলে আমি ধরতেই পারতাম না। স্পেশাল কফি না!
আরে, ত্রিশ বছর আগের সেই কথা আর কতকাল শোনাবে? আসিফ বিরক্ত হয়। আমি আছি স্বপ্ন নিয়ে, আর তোমার মনে পড়ে গেল স্বপ্নার কথা।
ওই স্বপ্ন মানুষে দেখে? তোমার আক্কেলজ্ঞান বরাবরই কম। আব্বা বলত, তখন বুঝিনি। এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। বাস্তবে এটা সেটা দিয়ে তো করোই, এবার স্বপ্ন দিয়েও আমার জীবনটাকে বরবাদ করে দেবে! ঘটনাটি ঘটার আগে কোনোভাবে ঘুম থেকে উঠে পড়তে পারতে না? স্বপ্নের মাঝে মানুষের ঘুম ভাঙতে পারে না? কথা শুনে আসিফ বুঝতে পারে নীরার ঝগড়ার মুড চালু হয়ে গেছে। তারও রাগ উঠে যায়।
এক্সাটলি। তুমি তো আমাকে ডেকে দিতে পারতে? প্রায়ই তো কারণে অকারণে ঘুম ভাঙিয়ে দাও। সকালে শান্তি করে কবে ঘুমাতে দিয়েছ? আজ ঘুমটা হলো তো, ধরা! আর আজ ডাকতে পারলে না, না? মানে বিপদে আমাকে ফেলতেই হবে?
জানি তো, এ বাড়িতে যাই ঘটুক দোষটা আমার ঘাড়ে এসেই পড়বে। শোনো, বিপদে তুমি একা না, আমিও পড়ব। ছেলেটার কথা ভাবো, তোমাকে ওই রকম একটা স্বপ্ন দেখার জন্য তুলে নিয়ে গেছে শুনলে দেশে ফিরতে পারবে? মেয়ে-জামাইয়ের নিরাপত্তা থাকবে? এমনিতেই ওর ব্যবসায়িক পার্টনারটা ওকে ধসানোর ছুতো খুঁজে বেড়াচ্ছে। কি বিপদে আমাদের ফেলতে যাচ্ছ ভেবে দেখেছ?
বিপদে যাতে আমরা না পড়ি, সেই ব্যবস্থা এখন করতে হবে। আচ্ছা, তুমি যে আমাকে টিকটিকি বলো সেটা তো এমনি এমনি বলো না; তাই না? দেখো তো ভালো করে, আমাকে টিকটিকির মতো দেখাচ্ছে না? বউকে জড়ানো কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে আসিফ।
আসিফের কথা শুনে চোখেমুখে উদ্বেগ রেখেই হেসে ফেলে নীরা। ভালো করে তাকিয়ে বলে, আসলেই তো। বলে আবার হাসে। ওর হাসির শব্দে আসিফ টের পায় ওর শরীর আস্তে আস্তে গুটিয়ে যাচ্ছে। শুকিয়ে যাচ্ছে হাত-পা। শরীরটা জড়ো হতে হতে, সংকুচিত হতে হতে টিকটিকি হয়ে যাচ্ছে। নীরা আরো জোরে হাসতে থাকে। আরো দ্রুত রূপান্তর ঘটে ওর শরীরে। এটা দেখে ভেতর থেকে স্বস্তি পায় আসিফ। এখন আর বোঝাতে হবে না, ওরা যদি আসে, দেখলেই চিন্তে পারবে। আমি মানুষ না, টিকটিকি। এইটা আর মুখে বলতে হবে না। আসিফ ভাবে। ভেবে হালকা অনুভব করে। সে বিছানা থেকে দেয়াল বেয়ে উঠে যেতে থাকে অনায়াসে। দূরে টিকটিকিটা ওকে দেখে ‘ঠিকঠিক’ বলে ডেকে ওঠে। আসিফও ঠিকঠাক করে জবাব দেওয়ার চেষ্টা করে। তবু ভয় কাটে না। যদি জেনে যায় সে আজন্ম টিকটিকি না, একটা সময় মানুষ ছিল এবং ওইরকম একটা স্বপ্ন সে সত্যিই দেখেছিল! ভেবে আবার ঘামতে থাকে। এবার দেয়াল ভিজে যায়, ঘরের ছাদ দিয়ে টপটপ করে পানি ঝরে।
নীরা মিস্ত্রি ডাকে ছাদ মেরামতের। সেফটি ট্যাংক ফেটে গেছে, হয়তো ফেটে গেছে দেয়ালের ভেতরকার কোনো পাইপ। মেরামতের জন্য কয়েকজন প্লামবার আসে। ওদের হাতে রেন্স, হাতুড়ে, হ্যাকস, মল গ্রিপ, প্লায়ার্স, স্নেক মেশিন, পাইপ কাটার। ওরা দেয়ালে ফিতা টেনে মাপামাপি করে। কিন্তু আসিফের মনে হয় ওদের দৃষ্টি অন্যকিছু সন্ধান করছে। সম্ভবত ওরা জেনে গেছে ওর স্বপ্নের কথা। আজকাল গোয়েন্দা বিভাগের লোকজন নানা কাজের ছুতো ধরে এভাবেই বেড রুমে পৌঁছে যাচ্ছে। আসিফের বন্ধু বলেছিল। এক্স পুলিশ, ভুল বলার কথা না।
মিস্ত্রিদের দেখে অসংলগ্ন আচরণ করে আসিফ। কোনো অঘটন ঘটিয়ে দিতে পারে, এই শঙ্কায় ওকে পাশের ঘরে আটকে রাখে নীরা। আজ আর অফিসে যেতে দেবে না। বিনা কারণে অফিসে না গেলে আবার চাকরি চলে যেতে পারে। কারণ একটা তৈরি করতে হবে। সেটার দায়িত্ব নীরাকেই নিতে হয়। লোকটা স্বপ্ন দেখেই খালাস, বাকি কাজ এখন আমাকেই করতে হবে। নীরা আসিফকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলে। নীরা কল করবে আসিফের ডান পাশের রুমে বসা সফিক সাহেবকে। আসিফ অবশ্য বলেছে সফিক সাহেবকে কল না করতে। তার আবার সন্দেহের বাতিক আছে। ফেরার পথে অফিসের গাড়িতে আসিফ একদিন বলেছিল, কলম কিনতে হবে। সামনের সিটে বসা শফিক সঙ্গে সঙ্গে মুখ বাকিয়ে বলেছিল, কম্পিউটার থাকতে কলম? কি মিয়া, ভেতর ভেতর কিছু পাকাচ্ছেন নাকি? আপনার চালচলন তো আজকাল স্বাভাবিক ঠেকছে না। সেই কথার পর আসিফ আর কলম তো কেনেইনি, উল্টো নিজের চালচলন ঠিক করার জন্য সুযোগ পেলেই আয়নার সামনে হাঁটা প্রাকটিস করেছে অনেক দিন। পেছনের কক্ষে বসা সহকারি পরিচালক শিলাকেও কলটা দিতে পারে। ওর সঙ্গে নীরার শাড়ি কেনার সম্পর্ক। কিন্তু তাতেও অসুবিধা আছে। শিলা শরীর খারাপ শুনলে চলে আসতে পারে। এমনিতে সহজ সরল মেয়ে, কিন্তু এসে যদি দেখে ঘরের দেয়াল দিয়ে পানি পড়ছে, মেঝে ভিজে গেছে, নিশ্চয় সন্দেহ না করে থাকতে পারবে না। আসিফ দুশ্চিন্তায় ছোট্ট একটা ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে থাকে।
রাউটারটা অফ করে দাও। নীরাকে ডেকে বলে।
কেন? কখন কে কল করে! তাছাড়া বড়ো বোন হসপিটালে, যে কোনো সময় একটা খবর আসতে পারে। নীরা অসম্মতি জানায়।
ইন্টারনেটের কারণে আজকাল অনেক কথা ফাঁস হয়ে যায়। দেখলে না সেদিন একটা কল রেকর্ড ফাঁস হওয়ার পর কি কাণ্ডটাইনা ঘটে গেল। যাও, খালি সুইচ বন্ধ না করে তারটাই খুলে দাও। কোথায় বসে কে আমাদের দেখছে কে জানে!
নীরা ওর কথা মতো তারটা খুলে দেয়।
আমরা যখন কথা বলব মোবাইলগুলো অন্য ঘরে রাখবে। বলে আসিফ।
মোবাইলে আবার কি সমস্যা? নীরা বিরক্ত হয়।
কেনো? সেদিন তুমি ভেবেছিলে বেনারশি পল্লীতে যাবে, কাউকে কিছু বলোওনি, অথচ এর পরপরই ফেসবুক খুলে দেখো শাড়ির বিজ্ঞাপন, তাও বেনারসি পল্লীর। তুমিই তো বললে। তাহলে? সব কথা কি বলতে হয়, নাকি নিজের ভাবনার উপর কারো কোনো নিয়ন্ত্রণ আছে? ও ঘরে বালিশের নিচে চাপা দিয়ে আসো। যখন দরকার হয় কথা বলে আবার রেখে দেখে ওভাবে। আর আমারটা অফ করে দাও।
নীরা তর্ক করে না। ও জানে আসিফের ভয় অনর্থক নয়। এই বয়সে লোকটাকে ধরে নিয়ে গেলে সহ্য করতে পারবে না। তাছাড়া থানা পুলিশ করার মতো পরিবারে কেউ নেয়। বাড়িতে মব ঢুকে পড়লে আরো অসুবিধা, সব লুটপাট করে তছনছ করে দেবে সাজানো সংসার, সামাজিক মান-মর্যাদা। এখন তাই যুক্তি দিয়ে কিছু বিচার করার সময় না। কদিন আগেও ওর ভাইয়ের ছেলেকে স্কুল থেকে তুলে নিয়ে গেছে। ক্লাস এইটে পড়ে, একা একা ভিডিও গেমস খেলতে খেলতে বলেছিল কথাটা, তাও ব্যাঙ্গ করে। ঘরের সেই কথা কিভাবে যেন পাবলিক হয়ে গেল।
মিস্ত্রিদের বলো সিসি ক্যামেরাগুলো খুলে দিতে। বলো নতুন সেট লাগাবে। উপযুক্ত কারণ না দেখালে সন্দেহ করতে পারে। নীরাকে ফের ডেকে বলে আসিফ।
সিসি ক্যামেরা থাকলে অসুবিধা কি? চুরি ডাকাতি বাড়ছে। তাছাড়া, কেউ বাড়ির আশেপাশে ঘুরঘুর করছে কিনা সেটাও দেখা উচিত। থাকুক না। নীরা মৃদু আপত্তি তোলে।
মালের নিরাপত্তা ছাড়ো, আগে জানের নিরাপত্তা। এই মুহূর্তে চাকরির কথাও ভাবতে হবে। এই বয়সে চাকরি গেলে চাকরি পাবো?
কেনো, প্রাইভেট ফার্মে কনসালটেন্সি করবে। কিছুদিন আগেও তো দ্বিগুণ বেতনের অফার পেলে।
তোমার মাথা না আন্ডা। তাও ফার্মের মুরগির। এই রকম একটা স্বপ্ন দেখার অভিযোগে চাকরি গেলে কেউ চাকরি দেবে মনে করছ? কেউ তো আর হাইড্রা না যে একটা মাথা কাটা গেলে দুটো মাথা গজাবে! সবারই মাথা হারানোর ভয় আছে।
তাও ঠিক। নীরা ভাবে। কোন কালে ফেসবুকে কি লিখেছিল তার জন্য এতো বছর পর এক স্কুল মাস্টারকে ধরে নিয়ে গেছে পুলিশ। সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। তাও তো সে কিছু একটা লিখেছিল, প্রতিবেশি ভদ্রলোক কিছুই লেখেনি, কোনো এক গ্রিক দার্শনিকের উদ্ধৃতি শেয়ার করেছিল মাত্র, তাতেই চাকরি চলে গেল। তার আয়ে দুটো পরিবার চলত, ছ মাস হলো লোকটা চাকরি পায়নি কোথাও। কদিন আগেই আত্মহত্যা করেছে। মরলেও ভালো ছিল। একটি প্রাইভেট ক্লিনিকের আইসিইউতে দিনকতক ভর্তি থেকে সেরে উঠেছে। ছাড়িয়ে আনার টাকা নেই। ভদ্রলোকের স্ত্রী লিফটে বলছিল, এর চেয়ে পুলিশ ধরে নিয়ে গেলে ভালো ছিল, কম টাকায় ছাড়িয়ে আনা যেত। আত্মহত্যার কথা মনে হতেই নীরার ভেতরটা ছড়াৎ করে ওঠে। তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বের হয়ে নিজেই লাঠির মাথা দিয়ে দু দিকের দুটো ক্যামেরা বাড়িয়ে বাড়িয়ে ভাঙে।
তুমি একটা কাজ করো, কবির ভাইকে কল করো। শুনেছি তিনি সচিব হয়েছেন গেল মাসে। মানুষের স্বপ্নেও আড়িপাতার কোনো যন্ত্রপাতি সরকারের আছে কিনা জেনে নাও। না থাকলে তো হলোই। অনেক ভেবেচিন্তে বলে নীরা।
পাগল! মোবাইলে বলে দিই আর রাষ্ট্র হয়ে যাক। তবে আইডিয়াটা ভালো বলোনি। কবির জানবে সব। ওর কাছ থেকে বুদ্ধি করে জেনে নেওয়া যায়। আসিফকে এতক্ষণে একটু চনমনে দেখায়।
তাহলে কল না করতে চাইলে কোনো কফি শপে বসো। তোমার বাল্যকালের বন্ধু, বললেই আসবেন।
কফি শপে না। ক্যামেরায় সব রেকর্ড হয়ে যায়। বাসায় আসতে বলি। ওতো বড়ো সচিব এখন, নিজের দরকারে বাসায় ডাকা ঠিক হবে কিনা। বরঞ্চ তার বাসাতেই যাই। কি বলো?
ভাবি গেস্ট পছন্দ করেন না। তুমি বলে দেখো, চলে আসবেন। তাছাড়া একটু খাইয়ে দেবে, তার তো ওই অভ্যাস আছেই। ওটার কথা বলো, দেখো আসবে।
হু। বলে আসিফ চুম করে বসে থাকে।
কবির সাহেব আসে। মাছ ভাজি আর বাদামের সালাদ সামনে দিয়ে ভ্যাট ৬৯-টা রেখে সরে যায় নীরা।
ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কোনো ভাবেই মূল কথায় আসতে পারে না আসিফ। দু ঘণ্টা প্রায় পার হয়ে যায়। নীরা গুঁতো খেয়ে অবশেষে বলে, আচ্ছা কবির, দেশের মানুষ কে কি বলছে, কে কি করছে সব তো জেনে যাস তোরা, না?
আরে, বলছে মানে কি! কে কি ভাবছে তাও আমরা জেনে যাই। বলে কবির হো হো করে হেসে ওঠে। তুই কি ভাবছিস আজকাল সেটাও বলে দিতে পারব। সব খবর আমাদের কাছে চলে আসে।
মাথার উপর বজ্রপাতের মতো জায়গাতেই ধাক্কা দিয়ে কেঁপে ওঠে আসিফের শরীর। ঘামতে শুরু করে সে। তাড়াতাড়ি নীরা এসে একটা তোয়ালে দিয়ে যায়। বলে, কবির ভাই আপনার বন্ধুর হাইপারহাইড্রোসিস হয়েছে। ওর ঘামা দেখে ভয় পেয়েন না যেন। মেঝেটা ভিজে গেলে পাদুটো তুলে বইসেন।
ভয়? তুমি ভুলে যাচ্ছ, আমি পাওয়ারফুল আমলা। সেক্রেটারি। আমাকে দেখেই তো মানুষে ভয় পাবে। তুমি খালি বলো কাকে ভয় দেখাতে হবে। বলে হো হো করে হেসে ওঠে কবির।
ভয়ে কাঁপতে থাকে আসিফ। নীরা শক্ত হয়ে বসে। আসিফের পাশ থেকে এখন উঠে পড়া ঠিক হবে না।
ভাই, মনের কথা পড়তে পারলে তো মানুষের স্বপ্নও পড়তে পারার কথা। মানে কে কি স্বপ্ন দেখছে, সেটাও তাহলে জেনে যেতে পারেন? নীরা খুব সহজভাবে প্রশ্নটা করার চেষ্টা করে।
স্বপ্ন? বলে হাহা করে হাসতে থাকে কবির। সম্ভবত খুব চড়ে গেছে। আগেই বোতলটা খুলে দেওয়া ঠিক হয়নি। কবিরের হাসির মধ্যে মানুষের স্বপ্নকে খুব তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার ব্যাপার আছে। কিন্তু তার মধ্যে সরাসরি উত্তরটা খুঁজে পায় না ওরা। একই প্রশ্ন দ্বিতীয় বার করা ঠিক হবে না, তাহলে সন্দেহ তৈরি হতে পারে ভেবে আসিফ আর নীরা নির্বাক বসে থাকে। কবির একটা করে কথা বলে আর হাসতে থাকে, হাসতে হাসতে কথা বলতে থাকে।
এই রকম একটা মন্ত্রণালয়ে জয়েন করলেন, কেমন লাগছে ভাই? নীরা প্রসঙ্গ বদলাতে বলে।
কেমন লাগছে মানে? দারুণ! দুর্দান্ত। আগে আমাকে বসরা দৌড়ের উপর রাখত, এখন আমি রাখি জুনিয়রদের। শালার চাকরিটাই এমন, হয় দৌড়াও না হলে দৌড়ের উপর রাখ। বুঝলে নীরা, আঙুলটা ব্যথা হয়ে গেল স্বাক্ষর করতে করতে। কবির বলে।
অনেক কাজ না? দেশের অনেক বড়ো বড়ো কাজ হচ্ছে তাহলে।
আরে, বড়ো কাজ কেমন কথা! বলো মহাকাজ। হাহাহা। প্রতিদিন চাকরি খাচ্ছি। আমার এক খোঁচাতে একজন, দুজন, বিশজন, একশো জন করে চাকরি চলে যাচ্ছে। জুনিয়রদের বলেছি, একজনের জন্য একটা স্বাক্ষর দিতে পারব না। হাত ব্যথা হয়ে যায়, ভাবি। বলেছি, একসঙ্গে বিশ ত্রিশ জন করে আনতে; ঠিক বলিনি?
ঠিকই তো। তাছাড়া আপনার যে প্যাঁচানো স্বাক্ষর, বার বার করা যায় নাকি? আচ্ছা ভাই, এতো চাকরি যাচ্ছে কেন বলতে পারেন?
চাকরি যাওয়া একটা মানবিক প্রক্রিয়া। যত চাকরি যাবে, তত পদ সৃষ্টি হবে, পদায়ন হবে। বলে আবারও হো হো করে হেসে ওঠে কবির।
তাই বলে বিনা কারণে মানুষের চাকরি চলে যাবে?
শোনো, বিনা কারণে এই পৃথিবীর একটা পাতাও নড়ে না। এইটা আমার না, ধর্মের কথা। সরকারি চাকরিরও একটা ধর্ম আছে—কাজ করো আর না করো, কথা বলা যাবে না। যা দেখার কথা না, তা দেখা যাবে না। চোখের সামনে পড়লেও দেখা যাবে না। কিন্তু যে দেখে ফেললো, সে তো অধর্ম করলো, তখন তো আর বিনা কারণে বলা চলে না।
কিন্তু কেউ যদি স্বপ্নে তেমন কিছু দেখে ফেলে? স্বপ্নে তো আর চোখ বন্ধ করা যায় না। মানে চোখ বন্ধ করেই যেটা দেখা হয়, সেইটা না দেখা যায় কেমন করে? প্রায় তিন ঘণ্টা পর আসল প্রশ্নে আসতে পারে ওরা। প্রশ্নটা নীরাই করে। পাশে থেকে কৌশলে পিঠ চাপড়ে দেয় আসিফ।
স্বপ্ন তো আরও ভয়ঙ্কর! যে স্বপ্ন দেখতে পারে, সে অনেক কিছু করে ফেলতে পারে। আমি ক্যাডার ট্রেনিংয়ে ইদানীং তো বলিই—তুমি তা, যা তুমি স্বপ্ন দেখো। স্বপ্নের মাধ্যমে মানুষের আসল রূপটা উঠে আসে। এইটা আমার কথা না, ফ্রয়েড বলে গেছে দুশো বছর আগে। স্বপ্ন দেখা বাঙালির বড়ো সমস্যা, উন্নতি জাতি কিন্তু এতো স্বপ্ন দেখে না, বুঝছ? সরকারের চেয়ারে বসে আমাদের প্রধান কাজ হলো জাতিকে উন্নত করা। বলে আবার হো হো করে হেসে ওঠে কবির।
আমি অবশ্য স্বপ্ন দেখি না। আসিফ বলে।
আমিও দেখি না। নীরা যোগ করে।
হ্যাঁ, আমরা দুজনেই কোনো স্বপ্ন দেখি না। আসিফ সংশোধন করে নেয়।
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় কি জানিস—তোদের মতো মানুষ স্বপ্নকে দেখে না, স্বপ্নই তোদেরকে দেখে। বলতে পারিস স্বপ্নই তোদেরকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাতে তোদের কোনো হাত নাই। আমাদের কিছুটা থাকতে পারে। সরি টু সে।
তাইলে আমি সাজা পাবো কেন? আমার চাকরি যাবে কেন। আসিফ মুখ ফসকে বলে ফেলে কথাটা। নীরা তাড়াতাড়ি ওর মুখের সামনে গ্লাস তুলে ধরে থামায়। কানের কাছে ফিসফিস করে বলে, বলেছিলাম, তুমি আজ খেয়ো না। হলো তো?
এখন কি হবে? ভুল করে ফেললাম নীরা। আসিফ বলে।
মহা ভুল। নীরা দাঁত খিটমিট করে ওকে ভর্ৎসনা করে।
তুমি বাঁচাও নীরা। আসিফ নিজেকে সমর্পণ করে দেয়।
কি ফিসফাস করিস দুজনে? আমাদের কাছে কিন্তু ফিসফাসের খবরও গোপন থাকে না। হাহাহা করে উচ্চস্বরে হেসে ওঠে কবির। নীরা আর আসিফও হাসার চেষ্টা করে।
শোন, তুই এখন কোন অফিসে যেন চাকরি করিস? কবির জানতে চায় কথাচ্ছলে।
এই রকম একটা প্রশ্ন শুনে আসিফ আর নীরা নড়েচড়ে বসে। নিজেদের দুর্ভাগ্য সম্পর্কে এবার তারা যেন নিশ্চিত হয়ে যায়। কোনো কিছুই আর গোপন করার উপায় নেই ভেবে আসিফ কোনো রকম কষ্ট করে বলে, কৃষি ইনস্টিটিউটে।
পরিচালক তো? কবির জিজ্ঞাসা করে।
না, উপপরিচালক। নীরা আসিফের হয়ে উত্তর দেয়।
পদটদ খালি আছে তো?
পরিচালক, উপপরিচালক খালি নাই। নিচের দিকে কিছু আছে। এইটা বলে তরতর করে ঘামতে থাকে আসিফ।
এই যে, বললাম না, পদ খালি না থাকাতেই সমস্যা। দেখি তোরে একটা চিঠি কাল ধরাই দিতে পারি কিনা। পদ খালি করা লাগব, বুঝছোস। এইটা একটা মানবিক কাজ। বলে আবারও হেসে ওঠে কবির। হাসতে হাসতে উঠে পড়ে আসন থেকে।
কবির চলে যায়। নীরা আর আসিফ বুঝে ফেলে স্বপ্নটা আর গোপন নেই। কবির সব ধরে ফেলেছে।
বড়ো ভুলটা হয়েছে কবিরকে ডেকে। আসিফ বলে। আমার কারণে কবির স্কুল-কলেজে ফার্স্ট হতে পারেনি। তার ওপর ওর বাবা আমাদের জমি বর্গা নিয়ে চাষ করেছে। ও যতই সচিব হোক, অবচেতনে ও আমার কাছে সাংঘাতিকভাবে পরাজিত। বললে না, ওর বউ অতিথি পছন্দ করে না! আসলে তা না। আসিফই চায়নি আমি কখনো ওর বাসায় যাই। ওর দাদা যে এলাকার কুখ্যাত চোর ছিল ওর বউকে গল্পে গল্পে সেসব কথা যদি বলে দিই—এই ভয়ে থাকে সব সময়। এই শহরে ওর ভেতরের খবর আমি ছাড়া কেউ জানে না। আমারই বোঝা উচিত ছিল, সুযোগ পেলে ওই আমাকে সবার আগে ধসিয়ে দেবে। বুদ্ধিটা দেওয়ার আগে এইটা তোমার মনে হলো না?
স্বপ্ন দেখলা তুমি। বন্ধুও তোমার, শত্রুও তোমার। দোষ আমার; না? রেগে যায় নীরা। কিন্তু এখন রাগারাগির সময় না। চাকরি যাওয়ার চেয়ে বড়ো কথা, যেকোনো সময় বাড়িতে পুলিশ চলে আসতে পারে। সমাজে মান মর্যাদা নিয়ে বেঁচে আছে ওরা। তাছাড়া মেয়ের সংসার আছে। ছেলেটাও বিদেশে ভালো আছে। একটা কিছু হয়ে গেলে সবাই ধসে পড়বে। এসব ভেবে দুজনে ড্রইংরুমে চুপচাপ বসে থাকে। রাত কেটে যায়, কেউ আর ওঠে না।
চাকরি গেলে অফিসের অনেকে মিষ্টি বিনিময় করবে। পেপারেও ছাপা হবে খবরটা। কারণ হিসেবে স্বপ্নের কথাও নিশ্চয় লেখা হবে! আসিফ ভাবে।
যে কোনো সময় পুলিশ চলে আসতে পারে, সাদা পোশাকে অথবা ইউনিফর্মে। মামলা ছাড়ায় এখন গ্রেফতার করা যায়। হয়তো জামিন নামঞ্জুর হবে, রিমান্ড মঞ্জুর করবেন হাইকোর্ট। খবরটা ছাপা হবে পত্রপত্রিকায়। এরপর দুজনের কেউ একজন আত্মহত্যা করলেও কোনো লাভ হবে না। যা ঘটার ততক্ষণে ঘটে যাবে। ভাবে নীরা।
ফজরের আজান দিলে শুতে যায় নীরা। আসিফ সোফাতেই ঘুমিয়ে পড়ে। নীরার ঘুমটা ভাঙে অনেক বেলা করে। তাও ভাঙত না যদি না মোবাইলটা বেজে উঠত।
ভাবি, আসিফ ভাই কি ম্যাজিক করেছে? অফিস থেকে শিলার ফোন। ওর উত্তেজিত কণ্ঠ শুনে আসিফের স্বপ্নটার কথা মনে পড়ে যায় নীরার। নিশ্চয় এতক্ষণে অফিসেও জানাজানি হয়ে গেছে! নীরার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়, কোনো কথা বের হতে চায় না। অনেক কষ্ট করে বলে, কেন কি হয়েছে? যেন কিছুই সে জানে না।
কি হয়নি তাই বলেন? বলে শিলা। আসিফ ভাইয়ের নামে অফিস অর্ডারটা মাত্রই আমাদের হোটসঅ্যাপ গ্রুপে পেলাম। এই জন্য বলি, বছরে একদিনও ছুটি না নেওয়া মানুষটা পরপর এভাবে ছুটিতে আছে কেন! যাই হোক, আসিফ ভাইকে আরো দুয়েকদিন পরে অফিস করতে বলেন, মিজান স্যারের লোকজন শকে আছে। বলে ফোনটা রেখে দেয় শিলা। কিংবা কলটা কেটে দেয় নীরা, শিলা হয়তো আরো কিছু বলত।
নীরা তাড়াতাড়ি গেস্টরুমে বালিশের নিচে রাখা আসিফের মোবাইলটা বের করে। রাউটার বন্ধ, মোবাইল ডাটা অন করে হোটসঅ্যাপটা খোলে। দুটো অফিস অর্ডার। প্রথমটা পরিচালক মিজান সাহেবের নামে। সরকারি শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে তাকে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। পরের অফিস অর্ডারটা ওপেন করার আগে ঘামতে থাকে নীরা। হাইপারহাইড্রোসিস ছোঁয়াচে কিনা জানে না, ওর শরীরটা আসিফের মতো ঘামতে শুরু করে। অফিস অর্ডারটা পড়ে কি করতে কিছুই বুঝে উঠতে পারে না নীরা। এইরকম অপ্রত্যাশিত ঘটনা ওর জীবনে দ্বিতীয়বার ঘটেনি। তাড়াতাড়ি ছুটে যায় আসিফের কাছে। আসিফ ড্রইংরুমে মেঝেতে শুয়ে আছে। ঘুমের মধ্যে সোফা থেকে পড়ে গেছে হয়ত। নীরা ধাক্কাতে থাকে, এই ওঠো, দেখো কি হয়েছে, তোমাকে পরিচালক পদে চলতি দায়িত্ব দিয়ে প্রমোশন দেওয়া হয়েছে। আসিফ ভাইয়ের কাণ্ডটা দেখো! লোকটাতে নিয়ে তুমি অকারণেই সন্দেহ করছিলে। আসলেই ভালো লোক। সরল মানুষ। তুমি লোকটাই প্যাঁচানো। শোনো, আমার বুদ্ধি নিয়ে খুব তো খোটা দিচ্ছিলে, এবার বোঝো। এবার থেকে বুদ্ধি আমি বিক্রি করবো, ফাউ ফাউ পাও তো, কদর বোঝো না।
আসিফ ওঠে না।
নীরা ধাক্কাতে থাকে।
Published in Samakal Eid Issue 2026



